গাড়ল পালন প্রদ্ধতি - গাড়ল কত মাসে বাচ্চা দেয়? বিস্তারিত জেনে নিন?
আজকে আমরা জানবো যে পশু লালন পালনের জন্য গাড়ল পালন প্রদ্ধতি কিভাবে করতে হয় ও কি কি প্রয়োজন পড়ে। ও তার সাথে সাথে এটাও জানবো যে গাড়ল কত মাসে বাচ্চা দেয় ও কিভাবে বাচ্চা পালন করবেন। আসুন জানি?
ভূমিকাঃ
আজকের দিনে গাড়ল ব্যবসা খুবই চলছে। আপনি চাইলে এই গাড়লের ব্যবসা শুরু করতে পারেন। এই ব্যবসা করলে জানলে আপনি খুবই লাভবান হয়ে ওঠবেন এক সময়। কেননা এই গাড়ল কমবেশি ছাগলের মত হয়ে থাকে।
| গাড়ল পালন প্রদ্ধতি |
গাড়ল পালন প্রদ্ধতিঃ
গাড়ল পালন একটি লাভজনক ব্যবসা হিসাবে ধরা হয়। এটি সাধারণত মাংস উৎপাদন বা পুনর্বাসনের জন্য করা হয়। এখানে গাড়ল পালনের প্রাথমিক পদ্ধতি দেওয়া হলো বিস্তারিত...
- গাড়ল নির্বাচনঃ
- স্বাস্থ্য পরীক্ষাঃ দাঁত, চোখ, পা, শিং, সামগ্রিক স্বাস্থ্য দেখে নিন।
- বয়সঃ ৮-১২ বছরের গরু (দুধ উৎপাদন শেষ, মাংস উৎপাদনে উপযুক্ত)।
- লক্ষণঃ কর্মক্ষমতাহীন কিন্তু রোগমুক্ত (ক্ষুরা, তড়কা, কৃমিমুক্ত)।
- খামারের স্থানঃ
- স্থানঃ শুকনা, উঁচু, বায়ু চলাচলযুক্ত।
- মেঝেঃ নরম খড়/বালি বিছানো (বুড়ো গরুর জন্য আরামদায়ক)।
- আয়তনঃ প্রতি গরুর জন্য কমপক্ষে ৪০-৫০ বর্গফুট জায়গা।
- ছাউনিঃ রোদ/বৃষ্টি থেকে রক্ষার ব্যবস্থা।ত
- খাদ্য ব্যবস্থাপনাঃ
- সবুজ ঘাসঃ ১৫-২০ কেজি/দিন (নেপিয়ার, প্যারা, দূর্বা)।
- খড়ঃ ৩-৪ কেজি/দিন (ভেজানো ও নরম করা)।
- দানাদারঃ ১-২ কেজি/দিন (ভুট্টা ভাঙা, গম ভাঙা, খৈল, ভুসি)।
- পুষ্টি সম্পূরকঃ
- খনিজ লবণ ব্লক (ক্যালসিয়াম, ফসফরাস)।
- ভিটামিন এ, ডি, ই ইনজেকশন বা খাদ্যে মিশ্রণ।
- পানিঃ ৩০-৪০ লিটার/দিন (পরিষ্কার ও তাজা)।
- স্বাস্থ্য পরিচর্যাঃ
- কৃমিনাশকঃ মাসে একবার (আলবেনডাজোল/ইভারমেকটিন)।
- টিকাঃ ক্ষুরা রোগ, তড়কার টিকা সময়মতো দিন।
- পায়ের যত্নঃ নিয়মিত খুর কাটুন, ক্ষত হলে অ্যান্টিসেপটিক দিন।
- দাঁত পরীক্ষাঃ বুড়ো গরুর দাঁত ক্ষয় হয়, নরম খাবার দিন।
- তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণঃ গরমে পানি ছিটানো, ছায়ার ব্যবস্থা।
- বিশেষ যত্ন (বুড়ো/আহত গরুর জন্য)
- হাঁটাচলাঃ হালকা ব্যায়াম করান, জয়েন্টে সমস্যা হলে মালিশ দিন।
- ব্যথানাশকঃ বাত/আর্থ্রাইটিস হলে ভেটেরিনারির পরামর্শে ওষুধ।
- ঘা/ক্ষত চিকিৎসাঃ নিয়মিত ড্রেসিং, মাছির প্রতিরোধ করুন।
- মানসিক যত্নঃ শান্ত পরিবেশ, নিয়মিত স্পর্শ/মালিশ।
- আয়-ব্যয় হিসাব (প্রতি গাড়ল)
খরচের খাত মাসিক আনুমানিক (৳)
খাদ্য (ঘাস+দানাদার) ৩,০০০ - ৪,০০০
ঔষধ/টিকা ২০০ - ৫০০
শ্রম/অন্যান্য ৫০০ - ১,০০০
মোট মাসিক খরচ ৩,৭০০ - ৫,৫০০
আয় পরিমাণ
মাংস বিক্রি (জীবিত ওজন) ৩৫০ কেজি × ৳১২০/কেজি = ৳৪২,০০০
৬ মাসের নিট লাভ ৳৪২,০০০ - (৫,০০০ × ৬) = ৳১২,০০০
গাড়ল পালন একটি সহানুভূতিশীল ও লাভজনক কাজ হতে পারে যদি যথাযথ স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও স্নেহের সাথে পরিচর্যা করা হয়। এটি গরুর জীবনকাল বৃদ্ধি ও কৃষকের বাড়তি আয়ের উৎস।
গাড়ল কত মাসে বাচ্চা দেয়ঃ
গাড়ল (বুড়ো/বয়স্ক গরু) সাধারণত ৫ মাস পরপর বাচ্চা দেয় অথ্যাৎ ১৫০ দিন পর পর। তবে এটি তার বয়স, স্বাস্থ্য ও প্রজনন ক্ষমতার উপর নির্ভর করে। গর্ভবস্থায় থাকা কালীন এরা প্রসাব করে থাকে। তবে এদের প্রজনন ক্ষমতা অর্জন করার জন্য এদের বাচ্চা হতে হতে ৮ - ৯ মাস সময় ব্যাপী লেগে যায়। আবার কারো কারো ক্ষেত্রে ৭ মাসে বাচ্চা হয়ে যায়।
আরো পড়ুনঃ কিভাবে আপনি কম ব্যাজেটে গরুর খামার করবেন তার বিশেষ টিপস জানুন?
গাড়ল সাধারণত ৯ মাস গর্ভধারণের পর বাচ্চা দিলেও, বয়স ও স্বাস্থ্যজনিত কারণে অনেক গাড়ল আর বাচ্চা দিতে অক্ষম হয়। তাই গাড়ল পালনের মূল উদ্দেশ্য মাংস উৎপাদন বা পুনর্বাসন হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। যদি গাড়লটি ১৫+ বছর বয়সী হয়, তাহলে তাকে বাচ্চা দেওয়ার চেষ্টা না করে শুধু মাংস উৎপাদন বা পুনর্বাসনের জন্য পালন করুন।
গাড়ল ও ভেড়ার পার্থক্য কিঃ
গাড়ল হলো ভেড়ার এক ধরনের কিংবা বলা যায় এর উন্নত জাতের মধ্য একটি সংকর জাত। এদের মধ্য কিছু পার্থক্য দেখা যায়। গাড়লের ভেড়ার থেকে কান ও লেজ বেশ লম্বা ও বড় হয় এবং গাড়লের ব্যবসা করলে তাদের প্রতি লাভের পরিমাণ বেশি আসে। নিম্নে দেখুন...?
বিস্তারিত পার্থক্যঃ
- গাড়ল: এটি আসলে বয়স্ক গরু (দুধ দেওয়া বন্ধ করেছে বা কর্মক্ষম নয়)। গরু হল বোভিডি গোত্রের।ক
- ভেড়া: সম্পূর্ণ আলাদা প্রজাতি, ওভিডি গোত্রের, ছোট রোমন্থক প্রাণী।
- গাড়ল: মূলত মাংস উৎপাদন বেশি, কখনো পুনর্বাসন কাজে ব্যবহার।
- ভেড়া: মাংস, উল, চামড়া, দুধ ও বাচ্চা – বহুমুখী ব্যবহার।
- গাড়ল: প্রচুর খাদ্য প্রয়োজন, বিশেষ যত্ন (বয়সজনিত সমস্যা)।
- ভেড়া: তুলনামূলক কম খাদ্য, দলবদ্ধভাবে চরানো সহজ, রোগপ্রতিরোধ ভালো।
- গাড়ল: বিনিয়োগ বেশি, কিন্তু একক মাংসের পরিমাণ বেশি, বাজার দর স্থিতিশীল।
- ভেড়া: বিনিয়োগ কম, দ্রুত বংশবৃদ্ধি, উল থেকে বাড়তি আয়, বাচ্চা বিক্রি সম্ভাবনা বেশি।
- গাড়ল: বয়সের কারণে বাত, দাঁত ক্ষয়, জরায়ু সমস্যা, ক্ষুরা রোগ ইত্যাদি বেশি।
- ভেড়া: PPR (ঢেঁকিলা রোগ), অন্ত্রের কৃমি, খুরা পচা ইত্যাদি সাধারণ রোগ।
- গাড়ল: বছরে সর্বোচ্চ ১টি বাচ্চা, বয়স বেশি হলে বন্ধ হয়ে যায়।
- ভেড়া: বছরে ১-২ বার, প্রতি বার ১-৩টি বাচ্চা (দ্রুত পাল বৃদ্ধি)।
- গাড়ল: রাখার বড় জায়গা, শক্তিশালী বেড়া প্রয়োজন।
- ভেড়া: কম জায়গা, দলবদ্ধভাবে রাখা যায়, সহজে স্থানান্তরযোগ্য।
গাড়ল পালন বয়স্ক গরুর পুনর্বাসন বা বড় আকারের মাংস উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত। আপনার লক্ষ্য, বাজেট ও সম্পদের ভিত্তিতে যেকোনো একটি বা উভয়ই পালন করতে পারেন।
গাড়লের মাংসের উপকারিতাঃ
গাড়লের মাংস পুষ্টিগুণে ভরপুর একটি স্বাস্থ্যকর খাবার যা ভেড়া থেকে আসে। এতে উচ্চমাত্রার প্রোটিন থাকে, যা শরীরের পেশি গঠন ও শক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। গাড়লের মাংসে আয়রন, আমিষ, পটাশিয়াম,কপার, জিঙ্ক ও ভিটামিন বি–১২ রয়েছে, ফসফরাস থাকে যা রক্তশূন্যতা কমাতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে থাকে। এতে চর্বির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্যও ভালো।
নিয়মিত ও পরিমিত পরিমাণে গাড়লের মাংস খেলে শরীর সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকে। যা সহজে ভিটামিন A, E, C এর মধ্য থাকায় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসাবে কাজ করে। যা আমাদের শরীরের কোলেস্টরল জমতে দেয় না।
গাড়লের মাংসের অউপকারিতাঃ
গাড়লের মাংস অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে কিছু অউপকারিতা দেখা দিতে পারে আমাদের জীবনে। এতে কোলেস্টেরল ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকায় বেশি খেলে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে চর্বি বাড়ার সম্ভবনা থাকে।। যাদের হজম সমস্যা আছে, তাদের জন্য গাড়লের মাংস হজমে সমস্যা হতে পারে। এছাড়া গেঁটে বাত, উচ্চ রক্তচাপ বা লিভারের সমস্যায় ভুগছেন এমন ব্যক্তিদের জন্য অতিরিক্ত গাড়লের মাংস ক্ষতিকারক। তাই স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে পরিমিত পরিমাণে খাওয়াই সবচেয়ে ভালো।
আরো পড়ুনঃ কোয়েল পাখি কত বছর বাঁচে ও তাদেরকে কি কি খাওয়াতে হয় জেনে রাখুন?
গাড়লের খাবারঃ
গাড়ল (ভেড়া) সাধারণত সহজলভ্য প্রাকৃতিক খাবার খেয়েই ভালোভাবে বেড়ে ওঠে। গাড়লের প্রধান খাবার হলো সবুজ ঘাস যেমন দুর্বা ঘাস, নেপিয়ার ঘাস, পাড়া ঘাস ও খেসারি ঘাস। এছাড়া খড় ধানের খড়, গমের খড়, ভুসি, শস্য, শাকসবজি শুকনা খাবার হিসেবে খুবই উপকারী তাদের বেড়ে ওঠার জন্য। শরীরের শক্তি ও দ্রুত বৃদ্ধি জন্য দানাদার খাবার দেওয়া যায়, যেমন ভুসি, ভুট্টা ভাঙা, গম ভাঙা ও খৈল, ভিটামিন এই সব খামারে থাকা গাড়লের জন্য প্রযোজ্য।
লেখকের মক্তব্যঃ
আসা করি যে আপনি বুঝতে পেরেছেন পশু পালনের জন্য গাড়ল পালন প্রদ্ধতি কিভাবে করতে হয়। ও তার সাথে সাথে এটাও জানলেন যে গাড়ল কত মাসে বাচ্চা দেয় ও বাচ্চার পালন প্রদ্ধতি।
প্রশ্ন থাকলে কিংবা ভাল লাগলে কমেন্ট করবেন ও শেয়ার করবেন আপনার প্রিয় মানুষের সাথে।
আরো কিছু জানতে বা শিখতে চাইলে ভিজিট করুন............... www.stylishsm.com
( আপনার প্রিয় ব্লগার স্টাইলিশ )
স্টাইলিশ এস এম নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হবে।
comment url