ছাগলের খাবার দেওয়ার নিয়ম কি - গর্ভবতী ছাগলের খাবার তালিকা? বিস্তারিত জেনে নিন?

আজকে আমরা জানবো যে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে ছাগলের খাবার দেওয়ার নিয়ম কি ও কিভাবে তাদের লালন পালন করতে হয়। ও তার সাথে সাথে এটাও জানবো যে গর্ভবতী ছাগলের খাবার তালিকা কি হয়ে থাকে। যাতে তারা পর্যাপ্ত পরিমানে খাবার হজম করতে পারে। আসুন জানি?

ভূমিকাঃ

আজকের দিনে দেখা যায় যে অনেকে ব্যবসা করে কোটিপ্রতি হয়ে গেছে। ব্যবসা এমন একটা জিনিস যেটি যার ধারা তার কপাল খুলে যায়। তাকে আর বড়লোক হতে আর কেউ আটকাতে পারে না। কিন্তু এই ব্যবসাই যেমন লাভ আছে তেমনি আবার লোসও আছে। আপনাকে দুইটা জিনিস মেনে যেকোনো ব্যবসায় মানতে হবে।

তাই আসুন যেনে রাখি যে, ছাগলের ব্যবসা করার ক্ষেত্রে ছাগলের খাবার দেওয়ার নিয়ম কি কি হয়ে থাকে ও কিভাবে লালন পালন করতে হয়। ও তার সাথে সাথে এটাও জানুন যে গর্ভবতী ছাগলের খাবার তালিকা কেমন হয়ে থাকে। তাদের জন্য কি আলাদা কোনো পদক্ষেপ নিতে হয়। নিম্নে বিস্তারিত............?

ছাগলের খাবার দেওয়ার নিয়ম কিঃ

ছাগল পোষার ক্ষেত্রে বা ছাগল পালন লাভজনক করতে হলে সঠিকভাবে খাবার দেওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ।সবার আগে ছাগলকে সুস্থ্য ও সবল রাখার জন্য প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় খাবার দিন। সাধারণত দিনে ২–৩ বার (সকাল, দুপুর, বিকাল) খাওয়ানো ভালো। খাবারে সবুজ ঘাস থাকতে হবে। যেমন—নেপিয়ার ঘাস, ঘাসপাতা, গাছের পাতা (কাঁঠাল, কলা, বাবলা ইত্যাদি)। এগুলো ছাগলের প্রধান খাবার। শুধু ঘাস নয়, সাথে শুকনা খাবার (খড়) ও কনসেনট্রেট ফিড দিতে হবে। যেমন—ভুসি, খৈল, ভুট্টা ভাঙা, ডাল ভাঙা। এতে ছাগল দ্রুত বড় হয়।

প্রতিদিন পরিষ্কার পানি দিতে হবে। পানি ছাড়া ছাগল ঠিকমতো খেতে পারে না এবং অসুস্থ হয়ে পড়ে।খাবারের সাথে সাথে মাঝে মাঝে লবণ ও খনিজ মিশ্রণ "ভাতের মার" (Mineral mix) দিতে হবে, এতে শরীরের পুষ্টি ঠিক থাকে। আর ছাগলকে কখনো পচা বা নষ্ট খাবার দেবেন না ও নষ্ট আপনি দিবেন না। এই গুলো মেনে চললে আপনি ঠিক সফল হয়ে দাঁড়াবেন। আর খাবারের পরিমান ১০০-২০০ গ্রাম রাখবেন।

গর্ভবতী ছাগলের খাবার তালিকাঃ

ছাগল পোষার ক্ষেত্রে যদি আপনার খামারে গর্ভবতী ছাগল থাকে তাহলে আপনাকে ছেলের মতো দেখাশুনা করা লাগবে। গর্ভবতী ছাগলের জন্য পুষ্টিকর ও সুষম খাবার খুব জরুরি। এতে মা ছাগল সুস্থ থাকে এবং বাচ্চাও ভালোভাবে বৃদ্ধি পায়। নিচে একটি সহজ ও কার্যকর খাবার তালিকা দেওয়া হলোঃ

১। সবুজ ঘাসঃ

নেপিয়ার ঘাস, কলা পাতা, কাঁঠাল পাতা, বাবলা পাতা প্রতিদিন প্রায় ২–৩ কেজি

২। শুকনা খাবারঃ

খড় (ধান/গমের খড়) প্রতিদিন ৫০০ গ্রাম – ১ কেজি

৩। দানাদার খাবারঃ

ভুসি, খৈল, ভুট্টা ভাঙা, ডাল ভাঙা প্রতিদিন ২০০–৪০০ গ্রাম (শেষের দিকে একটু বাড়ানো যায়)

৪। খনিজ ও লবণঃ

প্রতিদিন সামান্য (১০–২০ গ্রাম) এতে বাচ্চার হাড় গঠনে সাহায্য করে ও বাচ্চাকে সুস্থ্য রখাএ

৫। পরিষ্কার পানিঃ

সব সময় পর্যাপ্ত পরিমাণে দিতে হবে

৬। বিশেষ যত্নঃ

গর্ভের শেষ ১–২ মাসে পুষ্টিকর খাবার বাড়াতে হবে।

অতিরিক্ত মোটা বা অতিরিক্ত রোগা হওয়া ঠিক না।

পরিষ্কার ও শুকনো জায়গায় রাখতে হবে।

কিভাবে ছাগলের খাবার তৈরি করতে হয়ঃ

ছাগল পালন করতে হলে শুধু খামার বা ভাল খাবার দিলেই হয় না। তার সাথে সাথে ভাল পরিমাণে খাবার ও প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার তৈরি করতে হবে। ছাগলের জন্য নিজেরাই পুষ্টিকর খাবার (কনসেনট্রেট ফিড) তৈরি করলে খরচ কমে এবং ছাগল দ্রুত সুস্থভাবে বড় হয়।

  • প্রয়োজনীয় উপকরণঃ

  1. ভুট্টা ভাঙা – ৩০%
  2. গমের ভুসি – ৩০%
  3. সরিষা/সয়াবিন খৈল – ২০%
  4. ডালের ভাঙা – ১০%
  5. খনিজ মিশ্রণ (Mineral mix) – ২%
  6. লবণ – ১%
  7. (ইচ্ছা হলে) চালের কুঁড়া – ৭%
  8. প্রতিদিন একটি বড় ছাগলকে ২০০–৪০০ গ্রাম এই খাবার দিন
  9. সবুজ ঘাস ও খড়ের সাথে মিশিয়ে খাওয়ান
  10. ধীরে ধীরে পরিমাণ বাড়ান, একবারে বেশি দেবেন না

প্রথমে সব উপকরণ ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিন। তারপর নির্দিষ্ট অনুপাতে সবগুলো একসাথে মিশিয়ে নিন। ভালোভাবে মিশ্রণ করলে খাবার সমানভাবে পুষ্টিকর হবে। চাইলে হালকা পানি ছিটিয়ে নরম করে দিতে পারেন, যাতে ছাগল সহজে খেতে পারে।

ছাগলের প্রতিদিন কতটুকু প্রোটিন প্রয়োজনঃ

ছাগলে লালন পালন করতে হলে আপনাকে অনেক কিছু দেখা শুনা করে রাখতে হবে ছাগলকে। ছাগলে পালন করতে হলে তাদের অবশ্যই প্রোটিন প্রয়োজন হয়ে থাকে। কিন্তু তার আগে আপনাকে দেখে নিতে হবে যে ছাগলটি কোন অবস্থায় আছে। ছাগলের প্রতিদিন খাদ্যে ১০-১৮% ক্রুড প্রোটিন দরকার হয়। তা তার বয়স, ওজন ও অবস্থা (বাচ্চা, গর্ভবতী, দুধাল) অনুযায়ী ভিন্ন হয়। নিচে সহজভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হলো প্রোটিনের মান?

  •  সাধারণ প্রোটিন চাহিদা (শুকনো খাবারের ভিত্তিতে)

  1. বাচ্চা ছাগল (Growing): ১৪% – ১৬% প্রোটিন
  2. প্রাপ্তবয়স্ক (Maintenance): ১০% – ১২% প্রোটিন
  3. দুধাল ছাগল: ১৪% – ১৬% প্রোটিন
  4. গর্ভবতী ছাগল: ১২% – ১৪% প্রোটিন

  • দৈনিক হিসেবে (আনুমানিক)

  1. ধরুন একটি ২০–২৫ কেজি ওজনের ছাগল হলে খাবার দেওয়ার জন্য ভাল
  2. প্রতিদিন মোট খাবার (Dry matter) লাগে প্রায় ১–১.৫ কেজি
  3. এতে প্রোটিন দরকার হয় প্রায় ১০০–২০০ গ্রাম (পরিমাণভেদে)

  • প্রোটিনের ভালো উৎসঃ

  1. খৈল (সরিষা/সয়াবিন)
  2. ডালের ভাঙা
  3. ঘাস (বিশেষ করে লুসার্ন/নেপিয়ার)
  4. ভুট্টা ও ভুসির সাথে মিশ্রণ

এই সব খাবার আপনি আপনার ছাগলকে দিলে আপনার ছাগল সুস্থ্য ও সবল ভাবে বেড়ে ওঠবে ও প্রোটিনের মাণ গুনগত ভাবে পাবে।

ছাগলের খাবার রুচি বাড়ানোর ঔষধঃ

ছাগলে শুধু লালন পালন করলেই হয় না তাদের বিভিন্ন ধরনের সমস্যা থাকে সেটিও আপনাকে সমাধান করতে হবে। মানুষ যেমন অসুস্থ্য হয়। ঠিক তেমনি ছাগলও অসুস্থ্য হয়। আর ছাগল যখন অসুস্থ্য হয় তখন তাদের খাবার রুচি কমে যায়। তখন তারা খাবার ঠিক মতো খেতে পারে না। ফলে তারা রোগা ও অসুস্থ্য হয়ে পড়ে। ছাগলের খাবারের রুচি কমে গেলে সরাসরি “ওষুধ” দেওয়ার আগে কারণ খুঁজে ঠিক করা বেশি জরুরি। যেসব ওষুধ/সাপ্লিমেন্ট দেওয়া যায়?

  1. ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স (Vitamin B-Complex)
  2. লিভার টনিক
  3. মিনারেল মিক্স (Mineral mix)
  4. প্রোবায়োটিক (Probiotic)
  5. ডিওয়ার্মিং (কৃমির ওষুধ)
  6. জিঙ্ক সিরাপ বা ট্যাবলেট
  7. অ্যানোরা বা অ্যানোরেক্সন

আপনার পোষা ছাগল যদি খাবারের প্রতি রুচি না আসে সেক্ষেত্রে আপনি চাইলে এই ডোজ গুলো দিতে পারেন ছাগলকে।

ছাগলের রুচি বাড়ানোর উপায়ঃ

ছাগল লালন পালন করতে হলে আপনাকেও ছাগল হতে হবে। তাকে ঠিক মতো দেখা শুনা করা লাগবে তাদের খাবারের খেয়াল রাখতে হবে। অনেক সময় ছাগল খেতে চাই না। সেক্ষেত্রে আপনার কি করণীয় কাজ থাকবে সেটিও জেনে নিন?

ছাগলের রুচি (খাওয়ার ইচ্ছা) কমে গেলে আগে কারণ ঠিক করা জরুরি পচা খাবার, হঠাৎ ফিড পরিবর্তন, কৃমি বা হালকা অসুখ এগুলোই বেশি দায়ী। তারপর নিচের নিয়মগুলো মেনে চললে দ্রুত রুচি বাড়ে তাহলোঃ

১। তাজা ও সুস্বাদু খাবার দিন যেমন নেপিয়ার ঘাস, কাঁঠাল/কলা পাতা, কচি ঘাস দিন। ও মনে রাখবেন পচা বা ভেজা খাবার একদম দেবেন না

২। খাবারে বৈচিত্র ও মান আনুন সবুজ ঘাস + খড় + দানাদার ফিড (ভুসি, খৈল, ভুট্টা) একসাথে দিন

একই খাবার প্রতিদিন দিলে রুচি কমে। তাই খাবারের মান সময় সময় বদলাতে থাকবেন।

৩। খাবারে সামান্য লবণ বা একটু গুড় দিলে খাবার স্বাদ বাড়ে, খেতে আগ্রহ বাড়ে খাবারের প্রতি।

৪। পরিষ্কার পানি সবসময় রাখুন পানি কম পেলে ছাগল ঠিকমতো খায় না

৫। কৃমিনাশক প্রতিনিয়ত চেক করবেন কেননা পেটে কৃমি থাকলে রুচি কমে। তাই মনে করে ৩–৪ মাস পরপর কৃমির ওষুধ দিন ছাগলকে।

৬। মাঝে মাঝে ছাগলকে ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স ও মিনারেল মিক্স দিলে রুচি ও হজম ভালো হয়।

৭। পরিষ্কার ও শুকনো পরিবেশে রাখার চেষ্টা করবেন ছাগলকে। নোংরা বা ভেজা ঘরে থাকলে খাওয়ার আগ্রহ কমে যায়।

এই গুলো মান বন্টন মেনে চললে আপনার ছাগল সুস্থ্য ও রুচিশীল থাকবে।

ছাগলের খামারে লাভ কেমনঃ

হ্যাঁ, ছাগলের ব্যবসা করলে লাভ আছে। অল্প কিছু পুঁজি দিয়ে আপনি চাইলে এই ছাগলের ব্যবসা শুরু করতে পারবেন। তার আগে আপনার কিছু সঠিক পদক্ষেপ ও অভিজ্ঞতা প্রয়োজন হবে। ছাগলের খামার সাধারণত লাভজনক ব্যবসা হিসেবে ধরা হয়, তবে লাভ নির্ভর করে আপনার ব্যবস্থাপনা, খাবার, চিকিৎসা ও বাজার দামের উপর।

প্রথম কাজ ছাগল পালন করতে খরচ তুলনামূলক কম। গরুর তুলনায় খাবার, জায়গা ও যত্ন কম লাগে, তাই ছোট পুঁজি দিয়েও শুরু করা যায়। ছাগল দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে। একটি মা ছাগল বছরে ১–২ বার বাচ্চা দেয় এবং অনেক সময় একসাথে ২–৩টি বাচ্চাও হয়। এতে দ্রুত সংখ্যা বাড়ে এবং লাভের সুযোগ তৈরি হয়।

বাজারে ছাগলের মাংস খাসির চাহিদা সবসময় বেশি থাকে, বিশেষ করে কোরবানি বা উৎসবের সময় দাম আরও বাড়ে। সঠিকভাবে পালন করলে ৬–১০ মাসে একটি ছাগল বিক্রি করে ভালো লাভ করা যায়। সাধারণভাবে প্রতি ছাগলে ৩,০০০–১০,০০০ টাকা বা তার বেশি লাভ হতে পারে (পরিস্থিতি অনুযায়ী কম-বেশি হয়)। তাই আপনি চাইলে খামারে রেখেও লাভ করতে পারেন কিংবা বাজারে বিক্রি করে।

লেখকের মক্তব্যঃ

আসা করি যে আপনি বুঝতে পেরেছেন ব্যবসা করার ক্ষেত্রে ছাগলের খাবার দেওয়ার নিয়ম কি কি হয়ে থাকে। ও তার সাথে সাথে এটাও জানলেন যে গর্ভবতী ছাগলের খাবার তালিকা কি।

প্রশ্ন থাকলে কিংবা ভাল লাগলে কমেন্ট করবেন ও শেয়ার করবেন আপনার প্রিয় মানুষর সাথে।

আরো কিছু জানতে বা শিখতে চাইলে ভিজিট করুন.................. www.stylishsm.com



( আপনার প্রিয় ব্লগার স্টাইলিশ )


এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

স্টাইলিশ এস এম নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হবে।

comment url