আজকে আমরা জানবো যে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে এই বয়লার মুরগী পালন প্রদ্ধতি কিভাবে করে ও তাদের লালন পালন কেমন। ও তার সাথে সাথে এটাও জানবো যে বয়লার মুরগীর রোগ ও চিকিৎসা কিভাবে করতে হয় ও তাদেরকে কি ঔষুধ দেওয়া উচিত। আসুন জানি?
ভূমিকাঃ
আজকের দিনে কমবেশি মানুষ ছোট ছোট ব্যবসা দ্বারা অনেক মানুষ সফল হয়ে যাচ্ছেন। মানুষ ছোট থেকেই বড় হয়। আপনি চাইলে এই বয়লার মুরগী ব্যবসা শুরু করতে পারেন কিছু অর্থ দিয়ে। কিছু মাস একটু কষ্ট করলেই দেখবেন আপনিও সফলের দিকে এগিয়ে গেছেন।
তাই আসুন জেনে রাখি যে, বয়লার ম্যরগী ব্যবসা করার ক্ষেত্রে বয়লার মুরগী পালন প্রদ্ধতি কি কি হয়ে থাকে ও কিভাবে করতে হয়। ও তার সাথে সাথে এটাও জানুন যে বয়লার মুরগীর রোগ ও চিকিৎসা কিভাবে করতে হয়। নিম্ন বিস্তারিত.........?
বয়লার মুরগী পালন প্রদ্ধতিঃ
ব্রয়লার মুরগি পালন বর্তমানে লাভজনক একটি খামার ব্যবসা। এই মুরগি সাধারণত মাংস উৎপাদনের জন্য পালন করা হয় এবং অল্প সময়ে দ্রুত বড় হয়। সঠিক নিয়মে পালন করলে ৩০–৩৫ দিনের মধ্যেই বিক্রির উপযোগী হয়ে যায়। বয়লার মুরগীর ব্যবসা করতে হলে প্রথমে ভালো মানের ব্রয়লার বাচ্চা কিনুন সব বাচ্চা যেন সুস্থ্য ও সবল হয়।
বাচ্চা আনার আগে খামার পরিষ্কার করে জীবাণুমুক্ত করতে হবে এবং ঘরের তাপমাত্রা ঠিক রাখতে হবে। ছোট বাচ্চার জন্য প্রথম সপ্তাহে প্রায় ৩২–৩৩° সেলসিয়াস তাপমাত্রা রাখা ভালো। বাচ্চাদের জন্য শুরুতে স্টার্টার ফিড, পরে গ্রোয়ার ফিড দিতে হয়। পরিষ্কার পানির ব্যবস্থা সব সময় রাখতে হবে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে খাবার দিতে হবে এবং খাবার ও পানির পাত্র পরিষ্কার রাখতে হবে।
খামারের ভেতর বাতাস চলাচল, আলো ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। রোগ প্রতিরোধের জন্য সময়মতো ভ্যাকসিন ও ওষুধ দিতে হবে এবং অসুস্থ মুরগি আলাদা রাখতে হবে। সাধারণত ৩০–৩৫ দিনের মধ্যে ব্রয়লার মুরগির ওজন ১.৫–২ কেজি হয়ে যায়। তখন বাজারে বিক্রি করে লাভ করা যায়। সঠিক খাদ্য, পরিচর্যা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা বজায় রাখলে ব্রয়লার মুরগি পালন থেকে ভালো আয় করা সম্ভব।
বয়লার মুরগীর রোগ ও চিকিৎসাঃ
ব্রয়লার মুরগি দ্রুত বড় হয়, তাই সঠিক যত্ন না নিলে বিভিন্ন রোগ হতে পারে। খামারের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সঠিক খাবার ও সময়মতো ভ্যাকসিন দিলে বেশিরভাগ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। নিচে কয়েকটি সাধারণ রোগ ও তার চিকিৎসা সংক্ষেপে দেওয়া হলো দেখে নিন?
১. রানীক্ষেত রোগ (Newcastle Disease)
এটি খুবই মারাত্মক ভাইরাসজনিত রোগ। লক্ষণ হলো, মুরগি ঝিমিয়ে পড়ে, খাওয়ার মান কমে যায়, শ্বাস নিতে কষ্ট হয় এবং অনেক সময় ঘাড় বেঁকে হয়ে যায়।
চিকিৎসাঃ নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই, তাই প্রতিরোধই প্রধান উপায়। সময়মতো রানীক্ষেত ভ্যাকসিন দিতে হবে। প্রয়োজনে ডাক্তার দেখাতে হবে।
২. গামবোরো রোগ (Gumboro Disease)
এই রোগে মুরগি দুর্বল হয়ে যায়, পাতলা পায়খানা করে এবং পালক ফুলে থাকে। সাধারণত ছোট বাচ্চাদের বেশি হয়।
চিকিৎসাঃ পরিষ্কার পানি, ভিটামিন ও ইলেক্ট্রোলাইট দিতে হবে এবং খামার সব সময় পরিষ্কার রাখতে হয়।
৩. ককসিডিওসিস (Coccidiosis)
এই রোগে মুরগির পায়খানায় রক্ত দেখা যায়, ওজন কমে যায় এবং দুর্বল হয়ে পড়ে।
চিকিৎসাঃ ককসিডিওস্ট্যাট ওষুধ (যেমন—অ্যামপ্রোলিয়াম) পশু চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ডোজ দিতে হবে।
৪. শ্বাসতন্ত্রের রোগ (CRD)
এই রোগে মুরগি শ্বাস নিতে কষ্ট পায়, নাক দিয়ে পানি পড়ে এবং কাশির লক্ষণ দেখা যায়।
চিকিৎসাঃ অ্যান্টিবায়োটিক ও ভিটামিন পশু চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দিতে হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খামার সব সময় পরিষ্কার রাখা, ভালো খাবার দেওয়া এবং নিয়মিত ভ্যাকসিন দেওয়া। এতে ব্রয়লার মুরগির রোগের ঝুঁকি অনেক কমে যায়।
বয়লার মুরগী ঔষুধের তালিকাঃ
ব্রয়লার মুরগির খামারে সাধারণত কিছু অ্যান্টিবায়োটিক, ভিটামিন ও রোগ প্রতিরোধের ওষুধ ব্যবহার করা হয়। তবে এসব ওষুধ সবসময় পশু চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করা উচিত। নিচে খামারে ব্যবহৃত কিছু সাধারণ ওষুধের নাম দেওয়া হলো পড়ে নিন?
দিন | ঔষুধের নাম | ব্যবহার বিধি |
১ম–৩য় দিন | ডি-ভিট/১ | ২ ফোটা ঔষধ পানি/খাবারের সাথে মিশিয়ে ডি-ভিট/সেক্টা এক টানা ৭২ ঘন্টা চলবে। |
৪র্থ দিন | প্রিথ্রি WS / থায়ামিন প্লাস | ২৪ ঘন্টা চলবে। |
৫ম দিন | ES ADE + ভ্যাকসিন রানিক্ষেত | সকালে ES ADE দুধে/পানিতে, ভ্যাকসিন দিয়ে ADE চলবে। |
৬-৭ দিন | ক্যাল ড্রিংক / ক্যালসিয়াম | ক্যাল প্লেক্স/ক্যালসিয়াম ২ দিন সকালে দুধে/পানিতে, রাতে ১ম পানি ঔষধ + ভিটামিন তেল দিতে পারবেন। |
৮-৯ দিন | লিভার টনিক + জিংক | সকালে লিভার টনিক/দুধে জিংক, রাতে ১ম পানি ঔষধ তেল দিতে পারবেন। |
১০ দিন | ES ADE + ভ্যাকসিন গামবোরো | সকালে ES ADE দুধে ও পানিতে ভ্যাকসিন দিয়ে ADE চলবে। |
১১ দিন | ভিটামিন + ঔষধ পানি | সকাল/দুপুরে ঔষধ পানি, রাতে ১ম পানি ঔষধ তেল দিতে পারবেন। |
১২-১৫ দিন | এমোক্সিসিলিন + তেল | একটানা ৩ দিন চলবে। ১ লিটার পানিতে ১ গ্রাম। |
১৬ দিন | ES ADE + ভ্যাকসিন গামবোরো | সকালে ES ADE দুধে ও পানিতে ভ্যাকসিন দিয়ে ADE চলবে। |
১৭ দিন | ঔষধ পানি | সকাল/দুপুরে ঔষধ পানি, রাতে ১ম পানি ঔষধ তেল দিতে পারবেন। |
১৮-২১ দিন | লিভার টনিক + জিংক + তেল | সকালে লিভার টনিক/দুধে জিংক, রাতে ১ম পানি ঔষধ তেল দিতে পারবেন। |
২২ দিন | ES ADE + ভ্যাকসিন রানীক্ষেত | সকালে ES ADE দুধে ও পানিতে ভ্যাকসিন দিয়ে ADE চলবে। |
২৩-২৫ দিন | চকলেট + তেল | একটানা ৩ দিন চলবে। খাবার বা পানির সাথে মিশিয়ে। |
২৬ দিন | হেক্সিক PH / থ্রি প্লাস + ES ADE | সকালে পানিতে হেক্সিক PH / থ্রি প্লাস, দুধে জিংক + রাতে ES ADE। |
২৭-৩০ দিন | সিপ্রোফ্লক্সাসিন | ২৪ ঘন্টা চলবে। |
৩১-৩৫ দিন | হেক্সিক PH + লিভার টনিক + জিংক + ES ADE + সিপ্রোফ্লক্সাসিন | ২ দিন সকালে লিভার টনিকের সাথে হেক্সিক PH, দুপুরে নির্দিষ্ট জিংক চলবে, রাতে মাঝে মাঝে ES ADE + সিপ্রোফ্লক্সাসিন ঔষধ পানি চলবে। |
তাই খামারে ওষুধ ব্যবহার করার আগে অবশ্যই ভেটেরিনারি ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ।
বয়লার মুরগী কত দিনে বড় হয়ঃ
ব্রয়লার মুরগি খুব দ্রুত বড় হওয়ার জন্য পরিচিত। সাধারণত ৩০ থেকে ৩৫ দিনের মধ্যে ব্রয়লার মুরগি বাজারে বিক্রি করার মতো বড় হয়ে যায়। এই সময়ের মধ্যে মুরগির ওজন প্রায় ১.৫ থেকে ২ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। তবে মুরগি কত দ্রুত বড় হবে তা কিছু বিষয়ের উপর নির্ভর করে, যেমন—ভালো মানের বাচ্চা, সঠিক খাবার, পরিষ্কার পরিবেশ, পর্যাপ্ত পানি এবং নিয়মিত ভ্যাকসিন।
যদি এসব ঠিকভাবে পালন করা হয়, তাহলে ব্রয়লার মুরগি দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং খামারিরা কম সময়ে লাভ করতে পারে। অনেক খামারিরা ৩০–৩২ দিনের মধ্যেই মুরগি বিক্রি করেন, আবার কেউ কেউ বেশি ওজনের জন্য ৩৫–৪০ দিন পর্যন্ত পালন করেন। তাই বলা যায়, ব্রয়লার মুরগি সাধারণত এক মাসের মধ্যেই বড় হয়ে যায়।
ব্রয়লার মুরগির খাবারের তালিকাঃ
ব্রয়লার মুরগি দ্রুত বড় করার জন্য সঠিক ও পুষ্টিকর খাবার দেওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত ব্রয়লার মুরগির খাবার তিন ধাপে দেওয়া হয়। স্টার্টার, গ্রোয়ার ও ফিনিশার ফিড।
১. স্টার্টার ফিড (১–১০ দিন)
এই সময় বাচ্চা মুরগির দ্রুত বৃদ্ধি হয়, তাই প্রোটিন বেশি দরকার। স্টার্টার ফিডে সাধারণত ভুট্টা, সয়াবিন মিল, মাছের গুঁড়া, ভিটামিন ও মিনারেল থাকে। প্রতিটি বাচ্চা দিনে প্রায় ১৫–২০ গ্রাম খাবার খায়।
২. গ্রোয়ার ফিড (১১–২০ দিন)
এই সময় মুরগির শরীর দ্রুত বড় হয়। তাই শক্তি ও পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার দিতে হয়। প্রতিটি মুরগি দিনে প্রায় ৪০–৬০ গ্রাম খাবার খেতে পারে।
৩. ফিনিশার ফিড (২১–৩৫ দিন)
এই সময় মুরগি দ্রুত ওজন বাড়ায়। তাই উচ্চ শক্তি ও পুষ্টিযুক্ত খাবার দিতে হয়। প্রতিটি মুরগি দিনে প্রায় ৮০–১০০ গ্রাম খাবার খেতে পারে।
এই সব খাবার দেওয়ার মাঝে মাঝে আপনাকে সব সময় পরিষ্কার পানি, ভিটামিন ও মিনারেল মিশ্রণ দিতে হবে মুরগীকে। সঠিক সময়ে সঠিক খাবার দিলে ব্রয়লার মুরগি দ্রুত বড় হয় এবং ৩০–৩৫ দিনের মধ্যে বাজারে বিক্রি করার উপযোগী হয়ে যায়।
ব্রয়লার মুরগির কত দিনে ডিম দেয়ঃ
ব্রয়লার মুরগি মূলত মাংস উৎপাদনের জন্য পালন করা হয়, ডিম উৎপাদনের জন্য নয়। তাই সাধারণ খামারে ব্রয়লার মুরগিকে ডিম দেওয়ার জন্য বড় করা হয় না। সাধারণত ৩০–৩৫ দিনের মধ্যেই ব্রয়লার মুরগি বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়। তবে যদি ব্রয়লার মুরগিকে বিক্রি না করে লম্বা সময় পালন করা হয়
তাহলে সাধারণত ৪ থেকে ৫ মাস (প্রায় ১৫০–১৮০ দিন) বয়সে তারা ডিম দিতে শুরু করতে পারে। কিন্তু এদের ডিম উৎপাদন ক্ষমতা কম এবং নিয়মিত ডিম দেয় না। এ কারণে ডিম পাওয়ার জন্য খামারিরা সাধারণত লেয়ার জাতের মুরগি পালন করেন, কারণ লেয়ার মুরগি নিয়মিত ডিম দেয় এবং ডিম উৎপাদনের জন্যই উপযোগী।
ব্রয়লার মুরগির এলার্জি হলে কি করণীয়ঃ
ব্রয়লার মুরগির এলার্জি হলে সাধারণত শরীরে চুলকানি, পালক ঝরে যাওয়া, লালচে দাগ বা অস্বাভাবিক অস্থিরতা দেখা যায়। এই সমস্যা সাধারণত খাবারের পরিবর্তন, ধুলো-ময়লা, পোকা-মাকড় বা নোংরা পরিবেশের কারণে হতে পারে। তাই প্রথমে খামারের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং মুরগির খাবার ও পানির মান ঠিক আছে কিনা তা নিশ্চিত করতে হবে।
এলার্জি হলে মুরগিকে পরিষ্কার ও শুকনো জায়গায় রাখতে হবে এবং পুরোনো বা নষ্ট খাবার দিলে তা বন্ধ করতে হবে। অনেক সময় খামারে উকুন বা পরজীবী থাকলে মুরগির শরীরে চুলকানি হয়, তাই প্রয়োজনে খামারে জীবাণুনাশক স্প্রে করতে হবে। মাংসে কোনো প্রকার এলার্জি দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে এন্টিহিস্টামিন দিতে হবে।
মুরগির শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য পানির সাথে ভিটামিন ও মিনারেল (যেমন ভিটামিন AD3E বা ভিটামিন-সি) দিতে পারেন। যদি সমস্যা বেশি হয় বা অনেক মুরগি আক্রান্ত হয়, তাহলে দ্রুত পশু চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় ওষুধ ব্যবহার করা সবচেয়ে নিরাপদ।
লেখকের মক্তব্যঃ
আসা করি যে আপনি বুঝতে পেরেছেন ব্যবসা করার ক্ষেত্রে বয়লার মুরগী পালন প্রদ্ধতি কিভাবে করতে হয়। ও তার সাথে সাথে এটাও জানলেন যে বয়লার মুরগীর রোগ ও চিকিৎসা কিভাবে করবেন।
প্রশ্ন থাকলে কিংবা ভাল লাগলে কমেন্ট করবেন আপনার প্রিয় মানুষের সাথে।
( আপনার প্রিয় ব্লগার স্টাইলিশ )
স্টাইলিশ এস এম নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হবে।
comment url